আচ্ছা, কেমন হতো যদি আমি, আপনি, আপনারা আমাদের জীবদ্দশাতেই দেখতে পেতাম চাঁদে, মঙ্গল গ্রহে বা অন্যান্য গ্রহে গিয়ে বসবাস শুরু করেছে মানুষ! ভালো যে লাগতো এই বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ কিন্তু প্রশ্ন একটাই, সেটা কি আদৌ সম্ভব? অথবা যদি সম্ভব হয়, সেখানে কতদিন মানুষ বসবাস করতে পারবে? প্রশ্ন যখন আমি তুলেছি তখন উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও আমার আর সেই দায়িত্ব আমি যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করছি। প্রথমত, পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ অনেক বছর ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছে এই সৌরজগতের বেশকিছু গ্রহের সম্পর্কে তথ্য জোগাড়ের জন্য। বহু বহু কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ, তৈরি হয়েছে স্পেস স্টেশন, এবং এখন চেষ্টা চলছে এটা জানার জন্য যে সেখানকার পরিবেশ আদৌ কোনো জীবন ধারণের উপযোগী কিনা! আসল কথাটা এখানেই। আজ পর্যন্ত যে অজস্র টাকা খরচ হয়েছে অভিযানগুলোতে, সেই তুলনায় কি খুব আশাপ্রদ ফল আমরা পেয়েছি? মনে হয় না! অথচ এই পৃথিবীকে সুন্দর রাখার জন্য, দূষণমুক্ত রাখার জন্য যদি এই টাকা ব্যয় করত ওই সমস্ত দেশ, তাহলে আরো অনেক সুন্দর থাকতো এই পৃথিবী। এই পৃথিবী হয়ে উঠত একেবারে বিশুদ্ধ, নির্মল।
আচ্ছা, ধরা যাক, এই পৃথিবী সব দিক দিয়েই বসবাসের একেবারে অযোগ্য হয়ে উঠলো, তখন বাধ্য হয়ে মানুষ অন্য গ্রহে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করল এবং সেখানেও একটা ‘হিউম্যান কলোনি’ তৈরি হয়ে গেল এবং মানুষ সেখানেও দিব্যি গড়ে তুলল আর একটা পৃথিবী। আর তারপর? তারপর যেটা হবে সেটাকে ইংলিশে বলে- হিস্ট্রি রিপিটস ইটসসেল্ফ আর বাংলায় বলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। কেমন ব্যাপার সেটা! সেটা হল এই যে ঐ দ্বিতীয় পৃথিবীতে গিয়েও কিন্তু হিউম্যান সিভিলাইজেশনের ভালো-মন্দ দিক প্রতিফলিত হতে শুরু করবে! ভালো দিকটা হলো এই পৃথিবীর সবটুকু সম্পদকে যেভাবে টেকেন ফর গ্রেন্টেড করে নিয়েছি ,ঠিক সেই ভাবেই ঐ দ্বিতীয় বাসস্থানে গিয়েও মানুষ ঠিক তাই করবে আর খারাপ দিকটা হলো এই পৃথিবীকে চরমভাবে দূষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যা যা করেছি আমরা, অর্থাৎ প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পদ যথেচ্ছভাবে লুণ্ঠন করেছি যেভাবে, ওখানেও ঠিক ঠিক তাই করবো। যদিও আমি নিশ্চিতভাবেই জানি, এই পৃথিবী যেভাবে তার বিপুল সম্পদ আমাদের জন্য উজাড় করে দিয়েছে, কোনরকম প্রত্যাশা না রেখেই, সেইরকম সম্পদের এক কণাও সমগ্র সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর এই বিপুল সম্পদ আমরা ভোগ ও উপভোগ করেছি তো বটেই, সেই সঙ্গে শুধুমাত্র নিজেদের লোভ, লালসা আর খেয়াল চরিতার্থ করার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছি এই পৃথিবীকে প্রতিদিন,প্রতিমুহূর্তে। সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড’ জানিয়েছে মানুষের লোভ আর লালসার কারনে গত পঞ্চাশ বছরেই হারিয়ে গিয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ বন্যপ্রাণী।অর্থাৎ ২০ হাজার প্রজাতির ৬৮ শতাংশ হারিয়ে গিয়েছে।
এও জানিয়েছে, এখন যে হারে মানুষ প্রকৃতি আর পরিবেশকে ধ্বংস করছে তা অতীতের সব রেকর্ডকেই ভেঙে দিয়েছে। আর এই ধ্বংসের ঘটনা যে অনতিদূরে ভবিষ্যতে কমে যাবে, এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই আপাতত। আমরা বুঝেও বুঝতে পারছিনা, এর ফলে আমাদেরই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। নিজেদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছি। রিপোর্ট এও জানিয়েছে, মানুষের অত্যাচারে ২০০০ সাল থেকে ১৯ লক্ষ মাইল ভূমি হারিয়ে গিয়েছে। যা গোটা ব্রিটেনের ৮ গুণ। ১০ লক্ষ্য বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে। ১৩০ কোটি টন খাদ্য গত বছর নষ্ট হয়েছে। যার ফলে এক লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’-এর সমীক্ষা জানাচ্ছে, প্রাণী ও উদ্ভিদের ১ লক্ষ্য প্রজাতির মধ্যে ৩২ হাজার প্রজাতির বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গিয়েছে।
আবার আমরাই দ্বিতীয় পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছি, সেই গ্রহের অল্পস্বল্প সম্পদ যদি কিছু থাকে, তাহলে সেই সম্পদটুকু শেষ করতে ক’টা দিন লাগতে পারে! আমি নিশ্চিত যে ঐ অন্য গ্রহের সম্পদটুকুও মানুষের হাতে শেষ হতে শুধু কিছু সময়ের অপেক্ষা! আর তারপর কি হবে? আবার অন্য এক গ্রহের সন্ধান? আবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? আবারও ভালো কাজ করতে গিয়ে পৃথিবীর যে ক্ষতি করেছি আর খারাপ কাজ করতে গিয়ে পৃথিবীকে যেভাবে শোষণ করেছি, সেই কাজই করে চলবো? বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- ‘স্বভাব যায় না মলে’! আমি তার সাথে আরেকটু যোগ করে বলতে চাই- ‘অভ্যাস যায় না গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে গেলে’। এখানে অভ্যাস বলতে অবশ্যই কু-অভ্যাস। যে পৃথিবী আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এমনকি সমান আদর ও স্নেহে(এই প্রসঙ্গ নিয়ে এর আগে আলোচনা করেছি) মৃত্যুর পরেও আশ্রয় দেয়, তার সম্পদ ঢেলে দিয়ে আমাদের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে প্রতিমুহূর্তে, সেই পৃথিবীকে আমরা কখনো আপন ভাবতে পারিনি, ভাবতে পারিনি এই পৃথিবীকে একটু যত্নে তার সৌন্দর্য অক্ষুন্ন রাখতে পারলে, তার যে সম্পদ, তা যদি সুষ্ঠ ভাবে ব্যবহার করতে পারি, গাছপালা, বন-জঙ্গল কেটে, আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে আত্মঘাতী’মরণ উৎসবের যে শুভ(?) সূচনা করেছি বহুকাল আগে থেকেই, সেই আমরা, সেই চরম অকৃতজ্ঞ মানবজাতি, কখনোই অন্য কোন গ্রহকে নিজের বলে ভাবতেই পারবে না। এই পৃথিবীকে ভালবেসে, এই পৃথিবীকে সবথেকে আপনজন মনে করে আমরা যদি তার সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ বা দূষণমুক্ত রাখার চেষ্টা অথবা সৌন্দর্যায়নের অতি নিবিড় প্রচেষ্টা যখন আমাদের মধ্যে আসবে, তখন আমাদের ভাবনায় এই চিন্তাটাই আসবে যে, এই পৃথিবীকে যদি সুন্দর রাখতে পারি, যদি দূষণমুক্ত রাখতে পারি তাহলে এই পৃথিবী-মা যে আমাদের হাতে চূড়ান্তভাবে নির্যাতন আর অত্যাচার সহ্য করেও হাসিমুখে শুধু দিয়েই যায়, আমরা যদি তাকে একটু যত্ন করি, তাহলে আরো অনেক অনেক কিছু দেবে সে আমাদের, হাসিমুখে, পরম আদরে। আর তখন আর গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে বেড়ানোর প্রয়োজন হবে না। এই পৃথিবী-মায়ের আশ্রয়ে পরম নিশ্চিন্তে কাটাতে পারব আমরা। পৃথিবীতে যে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথা আমি বারবার বলছি, সেই স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে একমাত্র আমাদের শুভবুদ্ধি আর চেতনা জাগ্রত হলে। এই কথাটা যখন আমাদের মনে আসবে যে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহের কোন নির্দিষ্ট ঠিকানায় আমাদের ছুটে বেড়াতে হবে না যদি এই পৃথিবীকে ভালবেসে, তার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে আমরা পৃথিবীকে সুন্দর ও দূষণমুক্ত রাখতে পারি। এক দেশ যখন অন্য দেশকে দেখিয়ে দেওয়ার মনোভাব ত্যাগ করবে, যখন একজোট হয়ে এই পৃথিবীকে ভালবেসে তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করবে, তখন জোট বদ্ধ পৃথিবীতে হবে আর এক মহাযুদ্ধ যা হবে আক্ষরিক অর্থেই এক বিশ্বযুদ্ধ, যে যুদ্ধে অংশ নেবে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের কোটি কোটি মানুষ। সেই বিশ্বযুদ্ধে সব মানুষ থাকবে এক পক্ষে আর একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তারা লড়বে, আর লড়াইটা হবে পৃথিবীর সব মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যে লড়াইয়ের স্লোগান হবে একটাই- এই পৃথিবীকে আমাদের অপরিণামদর্শী কাজের জন্য ভয়ংকরভাবে দূষিত করেছি, ধ্বংস করেছি, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নষ্ট করেছি, কিন্তু আর নয়, আমাদের সেই অন্যায় কাজের জন্য আমরা অত্যন্ত অনুতপ্ত, সেই অন্যায় আমরা সংশোধন করে নেব এবং এই পৃথিবী আমাদের প্রথম ও শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল হয়ে থাকবে।